একটি বিচারের ফায়সালা

একটি বাড়ি বেচা-কেনা হওয়ার, দুদিন পরের ঘটনা। নতুন বাড়িওয়ালা এলো পুরানো বাড়িওয়ালার কাছে। পুরানো বাড়িওয়ালা জানতে চাইল, হঠাৎ কি মনে করে? নতুন বাড়িওয়ালা জানাল,এগুলো দিয়ে যেতে। আপনার বাড়িতে পাওয়া গেছে। মনে করলাম ভুলে হয়ত ফেলে এসেছেন। তাই দিতে এলাম। কি? নতুন বাড়িওয়ালা থলের মুখ খুলে পুরানো বাড়িওয়ালার সামনে তুলে ধরল, হীরে-জহরত। এটাই যে আপনার জিনিস ঠিক আছে কিনা দেখে রাখুন। এত হীরে-জহরত! পুরানো বাড়িওয়ালা অবাক হয়ে বলল। ঠিক আছে কিনা কি বলছেন ভাই? আরে ভাই, আমার বাড়িতে এত হীরে জহরত ছিল, তা আমি জানতাম না! এখন জানলাম যাক! এখন বলুন, কেন আমার কাছে এগুলো নিয়ে এসেছেন? নতুন বাড়িওয়ালা বলল, আবার কেন? আপনাকে দিতে। পুরানো বাড়িওয়ালা বলল, এগুলো কি আমার? আসলে এখন এগুলোর মালিক আপনি। ফেরত নিয়ে যান। আপনার যে কোন কাজে খরচ করুন গিয়ে। বললেই হলও নাকি? নতুন বাড়িওয়ালা চেঁচিয়ে বলল, আমি আপনার কাছ থেকে বাড়ি কিনেছি, হীরা-জহরত কিনিনি। আমি কেন এগুলোর মালিক হতে যাব। শুধু শুধু চেঁচিয়ে আর কথা কাটাকাটি না করে বরং যা বলি তাই করুন। নিন, ধরুন এগুলো নিয়ে চলে যান, খুশি হব। পুরনো বাড়িওয়ালাও রেগে বলল। এ মামুলী কথাটা আপনার মাথায় আসে না, যার বাড়িতে এত পরিমাণ হীরে-জহরত, সে কোন দুঃখ তার থাকার বাড়িটি বেচতে গেল? নতুন বাড়িওয়ালা বলল, এসব নসিহত-টসীহত আমি বুঝি না। বোঝারও কোন দরকার নাই। আপনার জিনিস আপনাকে বুঝিয়ে দিলাম। এখন তা রাখা না রাখা, আপনার খুশি। আপনি ফেলে দিন, তাতে আমার কি আসে যায়। আমি চললাম। দাঁড়ান ভাই! এত তাড়াহুড়া করছেন কেন? এগুলো নিয়ে যান। পুরানো বাড়িওয়ালা আবার তাকে বোঝাতে লাগল। দেখুন, আসলে যদি এগুলো আমার নিজের জিনিস হত তাহলে, ভুল কিছুতেই হতনা। এগুলো ভুল হওয়ার মত জিনিসই নয়। তাছাড়া, আমিও জানতাম না যে ও বাড়িতে হীরে-জহরত আছে। আমার কাছ থেকে বাড়ি কেনার দুদিন পর আপনি এগুলোর খোঁজ পেয়েছেন। কাজেই আইনগত মালিক এখন আপনিই। জী, মাফ করবেন! নতুন বাড়িওয়ালা ঝাঁঝাল সুরে বলল। আমি নই, আইনগত মালিক আপনিই। দেখছি, আমি ভাল পাগল নিয়ে পড়েছি। পুরানো বাড়িওয়ালা হয়রান হয়ে বলল। একজন ভাল করে গুছিয়ে বোঝাতে চায় মনে হয় যে আর একজন বুঝেও বুঝতে চায় না। শেষে এ নিয়ে তাদের দুজনে ঝগড়া বেঁধে গেল। সে কি ঝগড়া! বাপ রে বাপ! বেশ তাহলে, চলুন যাই বাদশাহর কাছে। পুরানো বাড়িওয়ালার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই নতুন বাড়িওয়ালা বলল: বেশ, চলুন যাই। বাদশাহ, উভয়ের কথাই মনোযোগ দিয়ে শুনে গেলেন। কিছুক্ষণ ভেবে, বাদশাহ হঠাৎ করেই বললেন – তোমাদের ছেলে মেয়ে? একজন বলল, আমার এক ছেলে। আরেকজন জানাল, আমার একটি মেয়ে। বাদশাহ এবার বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে কি যেন ভাবলেন। হ্যাঁ, তোমরা বাড়ি যাও। বিয়ের আয়োজন করো গিয়ে। নতুন ও পুরানো বাড়িওয়ালা হা করে বাদশাহর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তোমরা হা করে কি ভাবছ? আমার কথা শুনতে পাওনি? বাদশাহ রেগে বললেন যাও! তাড়াতাড়ি, দেরি করো না। যত তাড়াতাড়ি পারো সব ঠিকঠাক করো গিয়ে। আমি একটু পরেই আসছি। বিয়ে পড়িয়ে ফিরব। বাদশাহর হুকুম। হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না। হুকুম না মেনে শেষে কি জানটা খোয়াব? উভয়েই হয়তো এ কথাই ভেবে আপন পথে পা চালিয়ে দিল। বিয়ের মজলিস। নতুন পুরানো বাড়িওয়ালা পাশাপাশি বসে আছে। বাদশাহ তাদের ছেলে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেন। এরপর তাদের দুজনের মাঝে আর মন কষাকষির কোন প্রশ্নই থাকতে পারে না। ধুমসে খানাপিনা চলল। শাহী খানাপিনা! খানাপিনা শেষ হল। বাদশাহ মজলিস থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, হীরে জহরতগুলো নিয়ে এসে। আমাকে দাও, তাড়াতাড়ি করো। থলে আনা হল। বাদশাহ বললেন, আজ থেকে তোমরা কেউ আর এগুলোর দাবীদার নও। এখন থেকে এ হীরা হজরতগুলোর মালিক হল বর-কনে অর্থাৎ তোমাদের এ ছেলে-মেয়ে। আজ থেকে এক হাজার পাঁচশত বছর আগের এ ঘটনা। এ বাদশাহর নাম নওশেরওয়া। জ্ঞান, বুদ্ধি ও ন্যায় বিচারে সুপ্রসিদ্ধ ছিলেন।